‘আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হোক আমাদের দিন বদলের অনুপ্রেরণা’—এ মর্মবাণীকে সামনে রেখে গত শনিবার ১৬ অক্টোবর থেকে কুষ্টিয়ার ছেউরিয়ায় শুরু হয়েছে পাঁচ দিনব্যাপী বার্ষিক লালন স্মরণ উত্সব।এই উত্সবের আজ শেষ দিন। বাউলসম্রাট ফকির লালন শাহের ১২০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো এবারও লালনের ভক্ত, শিষ্য ও বাউলের পদচারণে আখড়াবাড়ি, লালন একাডেমী চত্বরসহ আশপাশের এলাকা উত্সব মুখর ও মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে।
বাংলালিংক পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত পাঁচ দিনব্যাপী এই মেলার উদ্বোধন করেন তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলালিংক খুলনার রিজিওনাল কমার্শিয়াল হেড বাবুল হক।
মূল উৎসব শুরু হওয়ার ২-৩ দিন আগে থেকেই আখড়ায় আসা বাউল সাধকরা মাজারের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে গেয়ে চলেছে সাইজির আধ্যাত্মিক মর্মবাণী ও ভেদ তথ্যের গান।সারাদেশ এবং দেশের বাইরে থেকে হাজার হাজার বাউল ও লালন ভক্তরা এসে জমা হয়েছে আখড়া বাড়িতে। কুষ্টিয়া পরিণত হয়েছে উৎসবের শহরে। কালী নদী তীরবর্তী লালন মঞ্চের সামনে আয়োজন করা হয়েছে গ্রামীণ মেলার। বিভিন্ন স্টলের পাশাপাশি থাকছে শিশু বিনোদনেরও ব্যবস্থা।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় উন্মুক্ত মঞ্চে বিশিষ্ট জনদের মুক্ত আলোচনা শেষে গভীর রাত অবধি চলে খ্যাতনামা শিল্পীদের পরিবেশনায় লালন সঙ্গীতানুষ্ঠান। রাত যতই গভীর হতে থাকে এখানে মানুষের চাপ যেন ততই বাড়তে থাকে।এই মঞ্চে সাধারনত সাধকদের দেখা যায়না।সাধকরা বেশিরভাগই নিজেদের সঙ্গী সাথীদের নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে গান বাজনা করেছেন।
মেলার এই ক’দিনের মধ্যে গত সোমবার তৃতীয় দিনেই সবচেয়ে বেশি লোকসমাগম ঘটেছিল। দুপুরের পর থেকে আখড়াবাড়িতে প্রবেশের দক্ষিণ দিকের দবির মোল্লার গেট থেকে পশ্চিমের মিলপাড়া গেট পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা জনসমুদ্রে পরিনত হয়েছিল এই দিন। আজ শেষ দিন হওয়ায় গতকাল থেকেই কিছুটা ভীর কমতে শুরু করে।
লালনের জন্ম মৃত্যু জাত পাত নিয়ে অনেক বির্তক রয়েছে। বাউলদের এই নিয়ে কোন মাথা ব্যাথা নেই। তারা এখানে আসেন শুধুমাত্র ভালোবাসার টানে। অনুষ্ঠান শেষে চলে যান আবার নিজ নিজ ঠিকানায়। ফকির লালন শাহের ১২০ তম মৃত্যুবার্ষিকী এবার।জন্ম সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও সাপ্তাহিক হিতকরী পত্রিকার মহাত্মা লালন ফকির প্রতিবেদন থেকে পন্ডিতরা অনেকটা নিশ্চিত মৃত্যুর তারিখ সম্পর্কে। তবে ড. আহমদ শরীফ, বসন্ত কুমার পাল, ড. আবুল আহসান চৌধুরী সহ একেক জন পন্ডিত একেক রকম বলেছেন ফকির লালন শাহ সম্পর্কে। অধিকাংশ পন্ডিতদের মতে, কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চাপড়ার ইউনিয়নের ভাড়রা গ্রামে ফকির লালন শাহের জন্ম। হিন্দু কায়স্থ পরিবারে তিনি জন্ম গ্রহন করেছিলেন। তার পিতা মাধব কর, মাতা পদ্মবতী। যৌবনে তিনি তীর্থ ভ্রমণে বের হয়ে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন এবং ভীষণ অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। তার সাথীরা তাকে মৃত ভেবে নদীতে ফেলে দেয়। তিনি ভাসতে ভাসতে গড়াই নদীর অববাহিকা কালিগঙ্গায় আসেন। এরপর স্থানীয় করিগর সম্প্রদায়ের মলম শাহ নামের এক বুজর্গ ব্যক্তি তাকে উদ্ধার করেন। মলম শাহ ও তার স্ত্রী লালনকে সেবা যত্নের মাধ্যমে তাকে সুস্থ্য করে তোলেন। মুসলমানের বাড়িতে অন্ন গ্রহন করায় তিনি নিজ বাড়ীতে ফিরলেও তাকে মেনে নেয়নি পরিবার ও হিন্দু সমাজ। ফিরে এসে ছেউড়িয়ার কারিগর সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় তিনি ছেউড়িয়ার আখড়া বাড়ি স্থাপন করেন। এরপর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি আখড়া বাড়িতেই কাটিয়ে ছিলেন। তবে বিভিন্ন সময় তিনি তীর্থ ভ্রমণ করেছেন বলে জানা যায়। ফকির লালন শাহের মত এবং পথ নিয়ে বিস্তর বিরোধ রয়েছে। কোন কোন পন্ডিত দাবী করেন ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলার হরিশপুরে তার জন্ম। কিন্তু অধিকাংশ পন্ডিত একমত কুষ্টিয়ার ভাড়রা গ্রামে জন্মের ব্যাপারে। ফকির লালন শাহের অনুসারীরা মূলত সহজিয়া। তারা যা পেতে চান তাও সহজ আনন্দ। তাদের সাধন প্রণালী বক্র নয় সহজ দেহ। তারা মনে করেন আত্মার মাঝে পরমাত্মার স্থিতি। যেহেতু আত্মার স্বরূপ বিশেষণ সম্ভব নয় তাই দেহ যন্ত্র বিশেষণ করে পরামাত্মার সন্ধান লাভ করা হয়।
ব্রিটিশ শাসন আমলে যখন হিন্দু ও মুসলিম মধ্যে জাতিগত বিবেধ সংঘাত বাড়ছিল তখন লালন ছিলেন এর বিরুধ্যে প্রতিবাদী কন্ঠ। তিনি মানুষে মানুষে কোন ভেদাভেদ এ বিশ্বাস করতেন না। তাঁর কাছে জাতি, ধর্ম, বর্ণ এসবের কোন দাম ছিলনা। তিনি ছিলেন মানবতাবাদী।বাউলদের জন্য তিনি যেসব গান রচনা করেন, তা কালে কালে এত জনপ্রিয়তা লাভ করে যে মানুষ এর মুখে মুখে তা পুরো বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে।
আজ উত্সবের শেষে সবাই ফিরে যাবে নিজ নিজ গন্থব্যে।আবারও বসবে ভক্তদের এই মিলনমেলা।ভক্তদের ভালোবাসা আর শান্তির বাণী নিয়ে লালন শাহ মানুষের মনে বেচে থাকবে চিরদিন।