শুরু হল একুশে গ্রন্থমেলা ২০১১
আজ ১৯শে মাঘ ১৪১৭/পহেলা ফেব্রুয়ারি ২০১১ মঙ্গলবার বিকেলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলা একাডেমী আয়োজিত মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থ’মেলা ২০১১ এবং একাডেমীর বর্ধমান হাউসে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় সাহিত্য ও লেখক জাদুঘর উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থনীতিবিদ নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ এবং সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট প্রমোদ মানকিন। অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমীর সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী।

স্বাগত ভাষণে বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, আজকের অনুষ্ঠানটি বাঙালি জাতীয় জীবনে অত্যন্ত- গুরুত্বপূর্ণ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সাংস্কৃতিক চেতনার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের জন্ম। এশিয়ায় এরূপ রাষ্ট্র সৃষ্টির ঘটনা বিরল। অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতার মধ্যদিয়ে শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের একক আন্দোলনের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের সৃষ্টি। ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফসল বাংলা একাডেমীর জন্ম মুক্তিযুদ্ধ আন্দোলনের মধ্যে প্রোথিত। তিনি বলেন, এবারের গ্রন্থ’মেলার অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে জাতীয় সাহিত্য ও লেখক জাদুঘর প্রতিষ্ঠা। বাল্টিমোরেই কেবল এরকম জাদুঘর রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলা একাডেমীর কর্মকাণ্ডের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (১ম-৫ম খণ্ড), বাংলাদেশের ইতিহাস (১ম-৪র্থ খণ্ড) প্রকাশ। তিনি আরও বলেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী উদ্যাপনের অংশ হিসেবে এবারের গ্রন্থমেলায় মাসব্যাপী সেমিনারে আলোচ্য বিষয়ের পুরোটাই রবীন্দ্র-কেন্দ্রিক করা হয়েছে। প্রতিদিন রবীন্দ্রনাথের জীবন ও কর্মের বিভিন্ন দিক নিয়ে দেশ ও বিদেশের বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ আলোচনা করবেন।
বিশেষ অতিথির ভাষণে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট প্রমোদ মানকিন বলেন, প্রতিবারের মতো এবারও ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে অমর একুশে গ্রন্থ’মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই মেলায় দেশের বিশিষ্ট লেখক ও পাঠকসহ সর্বস্তরের মানুষের সমাবেশ ঘটে। বাংলাদেশের গ্রন্থ জগতের সর্ববৃহৎ অনুষ্ঠান অমর একুশে গ্রন্থ’মেলা সকলের প্রেরণার উৎস হোক। আমি এর সার্বিক সাফল্য কামনা করি।
তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ বলেন, অমর একুশে গ্রন্থ’মেলা লেখক-পাঠকদের মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। এরকম মেলা আয়োজন ছাড়াও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জাতিগঠনে অসামান্য ভূমিকা রাখার জন্য আমি বাংলা একাডেমীকে সাধুবাদ জানাচ্ছি।
সম্মানিত অতিথি অধ্যাপক অমর্ত্য সেন বলেন, বাঙালির চেতনা ও ভাষা আন্দোলন অভিন্ন সূত্রে গ্রোথিত। ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী ধাপ মুক্তিযুদ্ধ হলেও বঙ্গবন্ধুর ক্যারিশমাটিক নেতৃত্বে বাংলাদেশের জন্ম। তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি অসামপ্রদায়িক জাতিরাষ্ট্র। অমর একুশে গ্রন’মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানের শুরুতে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ মূলত অসামপ্রদায়িক চেতনারই বহিঃপ্রকাশ
সভাপতির ভাষণে অধ্যাপক কবীর চৌধুরী বলেন, গ্রন্থ’মেলা আয়োজনের সাথে সংস্কৃতির বিকাশ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। জাতীয় জীবনে ধর্মান্ধতা, জঙ্গীবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ পরিহার করে আন্তর্জাতিকতাবাদে উত্তরণ প্রসঙ্গে অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের ‘আইডিয়া অব জাস্টিস’ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। তাহলেই বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত হবে।
প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বইমেলা আমাদের চিন্তাকে শাণিত ও মনকে উদার করে এবং হৃদয়কে করে মানবিকতা বোধে উজ্জীবিত। তাই আজকের এই আয়োজন কেবল কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাপার নয়। এর পেছনে রয়েছে আমাদের চেতনাকে পরিশীলিত করার তাগিদ, নিজেদের মহৎ ও কল্যাণধর্মী চিন্তায় নিয়োজিত করার প্রেরণা। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও গবেষণায় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের মাধ্যমে আমরা জ্ঞানভিত্তিক, কুসংস্কারমুক্ত, উদার ও পরমতসহিষ্ণু সমাজ গড়তে চাই। বিগত পঞ্চাশ বছরে বাংলা একাডেমী থেকে ভাষা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তি তথা জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রের যেসব বই প্রকাশিত হয়েছে তার ফলে বাংলাদেশে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের ভিত্তি মজবুত হয়েছে। এভাবে এ দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মননের ক্ষেত্রে এবং বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে বাংলা একাডেমী যে অবদান রেখেছে সেজন্য আমি বাংলা একাডেমীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। তিনি বলেন, বাংলা একাডেমী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী, সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যান – এই অঞ্চলকে ঘিরে একটি সংস্কৃতি বলয় নির্মাণ করা হবে। কারণ এই এলাকা বাংলাদেশের ভাষা ও স্বাধিকার আন্দোলনসহ সকল গণআন্দোলনের সূতিকাগার। এরফলে নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, তরুণ প্রজন্মের বেশি বেশি বই পড়া প্রয়োজন। কারণ গ্রন্থপাঠে জ্ঞানের বিকাশের পাশাপাশি মনের সংকীর্ণতা দূরীভূত হয়।
