বিজয় দিবসে বাংলা একাডেমীর আয়োজন
আজ মহান বিজয় দিবস। মহান মুক্তিযুদ্ধে বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আজ ২রা পৌষ ১৪১৭/১৬ই ডিসেম্বর ২০১০ বৃহস্পতিবার সকালে সাভার জাতীয় স্মৃতি সৌধে পুষ্পস-বক অর্পণ করেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। এ সময় একাডেমীর সচিব, পরিচালক, উপপরিচালক এবং সকল স-রের কর্মকর্তা ও কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন।
বিকেল ৪:০০টায় একাডেমীর নজরুল মঞ্চে আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে ‘শশাঙ্ক থেকে শেখ মুজিব : স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিবৃত্ত’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ‘দি ডেইলি সান’ পত্রিকার সম্পাদক অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। আলোচনা করেন ড. শাহদীন মালিক এবং অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ। স্বাগত ভাষণ দেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী।
স্বাগত ভাষণে বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, আজকের এই দিনটি আনন্দের হলেও এর পেছনে রয়েছে বিশাল বেদনার ইতিহাস। ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্র’ বাঙালির হাজার বছরের লালিত স্বপ্ন। নানা সংগ্রামের মধ্যদিয়ে সর্বোপরি ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালির সে স্বপ্ন বাস-বরূপ লাভ করে, আমরা অর্জন করি স্বাধীন একটি ভূখণ্ড। আজকের দিনে আমরা স্মরণ করছি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ত্যাগ-স্বপ্ন-সংগ্রাম এবং তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বকে, যার মাধ্যমে দেশের অগণিত মানুষ রক্ত দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। তিনি বলেন, নবনির্মিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঘোষিত অভিনব মূলনীতিগুলোতে বাংলাদেশের সর্বস-রের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে নানা সামরিক ফরমানের মাধ্যমে বাংলাদেশ জটিল অবস্থায় উপনীত হয়। ফলে ’৭২ সালে সৃষ্ট সংবিধানে ফিরে যাওয়াটা দুরূহ হয়ে পড়ে। আমাদের প্রত্যাশা, সকল প্রকার বৈষম্য দূরীভুত করে বর্তমান মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকার সত্যিকার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, বাঙালি জাতি পাল, সেন, ব্রিটিশ ও পাকিস-ান আমলের নানা শোষণ-নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে সর্বোপরি ’৭১-এ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে চূড়ান- বিজয় অর্জন করে। আমরা যদি বাংলার ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখব অবিভক্ত বাংলায় প্রথম স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাজা শশাঙ্কই বাংলা ও বাঙালির স্বাধীনতার সূচনা করেন। তিনি বলেন, বাঙালির স্বাধীনতার ইতিবৃত্তের শেকড় যত গভীরেই প্রোথিত থাক না কেন পূর্ববাংলার বাঙালিরা স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার রূপায়ণ করে রাষ্ট্রীয় সত্তা অর্জনের কৃতিত্বের অধিকারী। আর সে ইতিহাস মানেই স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস।
অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ইতিহাস এবং অতীত এক কথা নয়। কারণ ইতিহাস সৃষ্টি করা যায় কিন্তু অতীত সৃষ্টি করা যায় না। বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজনীতি কিংবা অর্থনীতির চেয়ে বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সংস্কৃতি। আর সেজন্যই সাংস্কৃতিক আয়োজনে জমায়েতটা তুলনামূলক বেশিই হয়। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ’২৫শে মার্চের গণহত্যা ছাড়া বাংলাদেশের ইতিহাস প্রকৃতভাবে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। কারণ বাঙালির স্বাধীন চিন্তাকে হনন করার প্রয়াসেই সুপরিকল্পিতভাবে এ গণহত্যা চালানো হয়। তিনি আরও বলেন, বাংলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সাধারণ মানুষের রাজনীতি-অর্থনীতি-সংস্কৃতি-মনস-ত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করতে হবে। তবেই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস প্রণয়ন করা সম্ভব হবে।
ড. শাহদীন মালিক বলেন, ইতিহাস হলো উত্তরোত্তর উন্নতির একটি ক্রমধারা। গভীর ইতিহাস চর্চা ছাড়া কোনো দেশের উন্নতি সম্ভব নয়। ইতিহাসের একটি বড় অবদান হলো জাতি গঠন। জাতি গঠনের ইতিহাস আমরা তৈরি করতে পারিনি, কেবল ’৫২ থেকে ’৭১ পর্যন- সময়ের সরলরৈখিক ইতিহাসই তৈরি করতে পেরেছি। মুক্তিযুদ্ধের চার দশক পরেও আমরা মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার কিংবা কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কোনো মুক্তিযুদ্ধ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। ফলে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস নিয়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে নানা বিভ্রান্তি। আশা করি, এ বিষয়ে সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন।
সভাপতির ভাষণে অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, আমরা জাতি হিসেবে যথেষ্ট ইতিহাসমনস্ক নই। প্রকৃতপক্ষে ইতিহাসকে জানার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানানোর কোনো প্রচেষ্টাও আমাদের নেই। তিনি বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে বিদ্যমান সংসদ, রাজনৈতিক দল ও সংগঠন খুব বেশি দিনের নয়। তাই আমাদের জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের ধারাবাহিকতা বারবার ক্ষুণ্ন হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা যথার্থভাবে তুলে ধরাই ঐতিহাসিকের কর্তব্য। এরূপ ধারাবাহিকতা অনুসন্ধানের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ তথা সাধারণ মানুষের ইতিহাস প্রণয়ন করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, আমরা বিজয় অর্জন করেছে ৩৯ বছর আগে। কিন’ প্রকৃতপক্ষে যে লক্ষ্য নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল সে লক্ষে আমরা আজও পৌঁছতে পারিনি। এখনও আমাদের প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হবে।
সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে জনাব আমানুল হকের পরিচালনায় ‘বাংলাদেশ’ শীর্ষক গীতি-নৃত্যালেখ্য পরিবেশন করে ‘বাংলাদেশ ব্যালে ট্রুপ’-এর সদস্যবৃন্দ।

