আপনি এখানে : হোম : : বাংলা একাডেমীতে চর্যাগীতি-নৃত্য বিষয়ক সেমিনার ও প্রদর্শনী

বাংলা একাডেমীতে চর্যাগীতি-নৃত্য বিষয়ক সেমিনার ও প্রদর্শনী

বাংলা একাডেমী ও উপমহাদেশীয় সংগীত প্রসার কেন্দ্র ‘সাধনা’ যৌথভাবে নেপাল থেকে আগত ইনস্টিটিউট অব নেপালিস পারফর্মিং আর্টস ‘কলামণ্ডপ’-এর অংশগ্রহণে গতকাল ২০শে অক্টোবর ২০১০ বিকেল ৩টায় বাংলা একাডেমীর সেমিনার কক্ষে চর্যাগীতি-নৃত্যের ঐতিহ্য বিষয়ে এক সেমিনার ও প্রদর্শনীর আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে নেপালে চর্যাগীতির ঐতিহ্য বিষয়ে আলোচনা করেন সর্বজ্ঞ বজ্রাচার্য, অধ্যাপক আফসার আহমদ, লুবনা মারিয়াম এবং ড. সাইম রানা। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। স্বাগত ভাষণে বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, হিন্দু রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও নেপালে বৌদ্ধ সংস্কৃতির চর্যাপদ আদরণীয় হওয়ার কী কারণ থাকতে পারে তা অনুসন্ধানের বিষয়। পার্শ্ববর্তী বিহার, উড়িয়্যা, অহমিয়া, হিন্দি, সৌরসেনী এসব ভাষাভাষী মানুষও চর্যাপদকে নিজের প্রাচীন সম্পদ বলে দাবি করে। সুতরাং সাংস্কৃতিক উৎস সন্ধানের মাধ্যমে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য গভীর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের সাংস্কৃতিক উপকরণ অন্যদের সংস্কৃতিতে কিরূপ প্রভাব ফেলছে তাও জানা প্রয়োজন। দেশের গবেষকদের এ বিষয়ে এগিয়ে আসার জন্য অনুরোধ করি। সর্বজ্ঞ বজ্রাচার্য নেপালের বৌদ্ধ সংস্কৃতির পরম্পরা বিষয়ে বলেন, নেপালে ‘চেচা হেলেগু’ নামে চর্যাগীতি আধ্যাত্মিক সংগীত হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়। বৌদ্ধ ধর্মে নানাতন্ত্রের মধ্যে চর্যাগীতি ‘যোগতন্ত্র’ রূপে স্বীকৃত। এরূপ বজ্রযান সংগীতের মাধ্যমে শরীরের পঞ্চতন্ত্রের মহাসুখ লাভ করা সম্ভব। তিনি বলেন, চর্যাগীতি নেপালে মূলত সাধনা সংগীতরূপে সমধিক পরিচিত। অধ্যাপক আফসার আহমদ বলেন, এটা মীমাংসিত সত্য যে, চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন। এর পরিবেশনা ও গীতবৈশিষ্ট্যের মধ্যে বাঙালির ছাপ বিদ্যমান। লেবেদেফ দিয়েই বাংলা নাটকের সূচনা হয়নি, বাংলা নাটক তার পূর্বেও ছিল। এর পরিচয় চর্যাপদে মেলে। বাংলা নাটকের সংলাপ, সংগীত ও নৃত্যের যে ত্রয়ী বন্ধন তা বৌদ্ধ নাটকেরই ধারাবাহিকতা। তিনি বলেন, চর্যাপদ সম্পর্কে আরও গবেষণা দরকার। এ বিষয়ে পণ্ডিতদের ভাবনা যদি তুলে আনা যায় তবে স্পষ্ট হবে যে, চর্যাপদ আমাদের একটি আকরগ্রন’। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে চর্যাপদ পাঠ ও পরিবেশনের মধ্যে সমন্বয় ঘটলে শাস্ত্রীয় বিষয় হিসেবে এটি অধিক গুরুত্ব লাভ করবে। লুবনা মারিয়াম বলেন, তান্ত্রিক সাধনের ক্ষেত্রে যে অবলম্বন গ্রহণ করা হয় তার মধ্যে চর্যাপদ অন্যতম। চর্যাপদ যখন গীত হয় তখন সংগীত নয়, ব্রজ নয়, লোক নয়, সেটা তান্ত্রিকতার বিষয়। তাই চর্যাগীতের মাধ্যমে দেহ ও মনের সংযোগ সাধন সম্ভব। এই সাধনার মধ্যদিয়ে একজন সাধক জ্ঞানের ক্ষেত্রকে আরও সমৃদ্ধ করে। বাংলা একাডেমী এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী চর্যাপদ নিয়ে নতুন গবেষণা কাজ শুরু করবে এই প্রত্যাশা করি। ড. সাইম রানা বলেন, চর্যা মার্গ সংগীত নয়, বরং দেশি গান। দেশি গানের বৈশিষ্ট্য হলো তা ক্রিয়াত্মক প্রধান। এই গান সর্বসাধারণের জন্যে গীত। যেমন ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া ইত্যাদি। তবে সাধারণ লোকসংগীতের মতো চর্যা দেশি গান নয়, তান্ত্রিক ও সাধনমার্গের সহায়ক হিসেবে চর্যাগীতি গাওয়া হতো। তিনি বলেন, আজকের এই অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে সংগীত, নৃত্য ও পরিবেশনার ইতিহাস নতুন করে শুরু হতে পারে যদি যথার্থ মর্মে ভবিষ্যতে গবেষণার সুযোগ আসে। চর্যাপদ একটি গুপ্ত সাধনতান্ত্রিক বিষয় বিধায় তা অনুসন্ধান করা আমাদের জন্য জরুরি। এর মাধ্যমে আমাদের লোকসংগীতের অসি-ত্বের সন্ধান পাব। আমি আশা করি, সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির তান্ত্রিকতার ইতিহাস সম্পর্কে নতুন তথ্যের সন্ধান মিলবে। সভাপতির ভাষণে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, সপ্তম শতাব্দীতে আসাম থেকে বিহার পর্যন- তন্ত্রের প্রভাব ছিল। এই তন্ত্র সহযানী সাধনা রূপে সুর সহযোগে গীত হতো। সংস্কৃতি সবসময়ই পরিবর্তনশীল এবং এতে অন্যান্য সংস্কৃতির নানা উপকরণ স্বাভাবিকভাবেই সংযোজিত হয়। চর্যাগীতের মধ্যে বহুমাত্রিক শিল্পের সমন্বয় ঘটেছে। এ বিষয়টিও আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে। আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে রাজেন্দ্র শ্রেষ্ঠ-এর পরিচালনায় চর্যানৃত্য পরিবেশন করে ইনস্টিটিউট অব নেপালিস পারফর্মিং আর্টস ‘কলামণ্ডপ’-এর শিল্পীবৃন্দ। এতে অংশ নেন দিনেশ ছেত্রী, মচ্ছরাজা মহার্জন, রূপকমল ছেত্রী, মীনা বজ্রচার্য্য গমাল, দৃষ্ঠি শ্রেষ্ঠ প্রমুখ।

আপনার মন্তব্য লিখুন